প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন::
সম্প্রতি আবারো মব সন্ত্রাস নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে উঠেছে। দেশের সরকার, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দল সকলেই মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। কিন্তু তারপরও মব সন্ত্রাস থামানো যাচ্ছে না। আমাদের দেশে জনরোষ ও মবকে একসাথে মিলিয়ে দেখা হয়। আমরা মবকে তো মব বলিই, একই সাথে জনারোষকেও মব বলে চালিয়ে দেই। ফলে কোনটা জনরোষ আর কোনটা মব আলাদা করা দুরূহ হয়ে যায়। বিশেষ করে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর যারা ফ্যাসিবাদের সহযোগী ছিল তাদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভকে মব বলে চালিয়ে দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের সহযোগী মিডিয়াগুলো জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তারাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে জনগণের ক্ষোভকে মব হিসাবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। মব ও জনরোষকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা গেলে এটি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হতো। মব সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ। উশৃঙ্খল জনতা নিজের ব্যক্তিগত বা দলগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য কাউকে আক্রমণ করলে, হেনস্থা করলে সেটিকে মব বলা যায়। এক্ষেত্রে এসব জনতার সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য থাকে না। তাদের প্রধান লক্ষ্য নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি। কিন্তু জনরোষকে এককথায় বেআইনি বলা যাবে না। মানুষ যখন কোন ঘটনায় বারবার নিপীড়িত হয়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে কোন কা- ঘটায় সেটাই জনরোষ। এক্ষেত্রে আইনের শাসন না থাকা কিংবা আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকা কিংবা বিচার বিলম্বিত হওয়া কিংবা বিচার না হওয়া কারণ হিসেবে কাজ করে। তবে মব বা জনারোষ দুটিই সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। উভয় ক্ষেত্রেই একদল জনতার দ্বারা অন্য মানুষ বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, হেনস্থা হয়, নির্যাতিত হয়। যা কারোই কাম্য হতে পারে না। কেউ নির্দেশ দিলেই বা অনুরোধ করলেই জনরোষ ও মব বন্ধ হয়ে যাবে এমনটি ভাবার কোন কারণ নাই। সবাই মিলে ঘৃণা করলেও জনরোষ ও মব পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে তাও ঠিক নয়। তাহলে কিভাবে মব বা জনরোষ বন্ধ হতে পারে? মূলত সমাজে জনরোষ বা মব কালচার গড়ে ওঠে বিচারহীনতার সুযোগ নিয়ে, অথবা বিলম্বিত বিচারের সুযোগ নিয়ে। মানুষ যখন নিজে নির্যাতিত হয়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে, সমাজের কাছ থেকে দ্রুত ও কাক্সিক্ষত সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত বিচার পায় না, তখনই নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনরোষ হ্রাস করা সম্ভব। জনগণ যদি দ্রুত ন্যায়বিচার পায়, সঠিক বিচার পায়, নির্মোহ বিচার পায় তাহলে জনরোষ এমনিতেই কমে যাবে। সমানাধিকার, মানবাধিকার, সুষম সুযোগ জনরোষ কমাতে ভূমিকা রাখে। সমাজে ও দেশে ঘুষ, অনিয়ম, বৈষম্য, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকা- বৃদ্ধি পেলে জনরোষও বৃদ্ধি পায়। তাই এসব কমানোর মাধ্যমে জনরোষ কমানো যেতে পারে। কিন্তু মব কমাতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। দ্রুত ও কঠোর শাস্তির মাধ্যমে মব কমাতে হবে। মবকারী যেহেতু ব্যক্তিগত বা দলগত স্বার্থসিদ্ধির আশায় অন্যকে হেনস্থা করে, পর্যদস্ত করে, আহত করে, হয়রানি করে- তাই আইনের কঠোর ও দ্রুত প্রয়োগের মাধ্যমে তা দমন করতে হবে। একটি সুস্থ সুন্দর সমাজে মব বলে কিছু থাকতে পারে না। কিছু ব্যক্তি বা দল দ্বারা অন্যকে হেনস্থা করা মেনে নেয়া যায়না। তাই নিরাপদ ও সুন্দর সমাজ গড়ার লক্ষ্যে আমাদেরকে অবশ্যই মব কালচার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর সেজন্য যারা মাবের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
[লেখক- প্রফেসর মোঃ শাহাদত হোসেন, অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
মব সন্ত্রাস বন্ধে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হল আইনের কঠোর ও দ্রুত প্রয়োগ
- আপলোড সময় : ১৩-০৩-২০২৬ ০৪:৫৩:০৪ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৩-০৩-২০২৬ ০৪:৫৬:২৬ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক